Logo
Logo
×

রাজধানী

সিটি করপোরেশনের অধীনে যাচ্ছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ১২:১০ পিএম

সিটি করপোরেশনের অধীনে যাচ্ছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা

রাজধানীর অভিজাত আবাসিক অঞ্চলগুলোর তালিকায় বহু বছর ধরেই শীর্ষে রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। পরিকল্পিত সড়ক, বহুতল ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক অবকাঠামো-সব মিলিয়ে এটি কার্যত রাজধানীর ভেতর আরেকটি স্বতন্ত্র নগর। কিন্তু এতসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে ছিল আলোচনায়-ঢাকার এত বড় একটি আবাসিক এলাকা কেন এখনো সিটি করপোরেশনের আওতার বাইরে?

অবশেষে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সরকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ‘স্বতন্ত্র নগর’

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার শুরুটা হয়েছিল রাজধানীসংলগ্ন কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদের অধীন বিস্তীর্ণ এলাকায়। ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে ওঠে বহুতল আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আধুনিক অবকাঠামো। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিলেও পুরো এলাকাটি কখনো সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে আসেনি।

ফলে এখানকার নাগরিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়েছে মূলত বসুন্ধরা গ্রুপের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা পানি নিষ্কাশনের মতো অনেক সেবা তারা নিজস্ব কাঠামোতে পরিচালনা করেছে। কিন্তু নাগরিকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ ছিল-ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতো তাঁরা নির্বাচিত সিটি করপোরেশন প্রতিনিধির মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক নাগরিক সেবা পাননি।

বিশেষ করে জন্ম-মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা সমন্বয়, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণসহ নানা সেবায় জটিলতা ছিল দীর্ঘদিনের।

বহুবার উদ্যোগ, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার আলোচনা নতুন নয়। বিগত কয়েকটি সরকার বিভিন্ন সময়ে এ উদ্যোগ নিলেও নানা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতায় তা থেমে যায়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা বলছেন, মূল জটিলতা ছিল প্রশাসনিক সীমা পুনর্নির্ধারণ এবং বিদ্যমান অবকাঠামো ও সেবার দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে। কারণ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অভ্যন্তরীণ অনেক সেবা দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের টানাপোড়েন বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজধানীর বাইরে থাকা বৃহৎ আবাসিক অঞ্চলগুলোকে সিটি করপোরেশন কাঠামোয় আনার বিষয়ে গুরুত্ব বাড়ে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন যুক্তি দেওয়া হচ্ছে-ঢাকার মতো একটি মহানগরে আলাদা ‘বেসরকারি প্রশাসনিক দ্বীপ’ রেখে সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।

কী থাকতে পারে আইনে:

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন আইনে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হতে পারে। এর ফলে

হোল্ডিং ট্যাক্স ও নাগরিক কর সিটি করপোরেশন আদায় করবে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা তদারকি করবে সিটি করপোরেশন

ভবিষ্যৎ অবকাঠামো উন্নয়ন সমন্বিত নগর পরিকল্পনার আওতায় আসবে

নির্বাচিত কাউন্সিলরের মাধ্যমে স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।

জরুরি সেবা, অগ্নিনিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়বে

তবে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের বিদ্যমান নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার কিছু অংশ আগের মতো বহাল থাকতে পারে বলেও আভাস পাওয়া গেছে।

বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ও শঙ্কা:

বসুন্ধরার অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহি বাড়বে। দীর্ঘদিন ধরে একটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকার কারণে তাঁরা সরাসরি জনপ্রতিনিধির কাছে জবাব চাইতে পারতেন না। তবে অন্য একটি অংশের মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে অতিরিক্ত করের বোঝা বাড়তে পারে, একই সঙ্গে বর্তমানে যে তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বসুন্ধরার একজন বাসিন্দা বলেন, 'আমরা নাগরিক সুবিধা চাই, কিন্তু সেই সঙ্গে বসুন্ধরার যে পরিকল্পিত পরিবেশ আছে, সেটাও ধরে রাখতে হবে।'

নগর বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম মনে করেন, বসুন্ধরাকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা সময়ের দাবি।

তাঁর ভাষায়, 'ঢাকা শহরের ভেতরে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালিত আবাসিক অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় না থাকলে ট্রাফিক, বর্জ্য, পানি নিষ্কাশন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় সমস্যা তৈরি হয়।'

তিনি আরও বলেন, 'তবে শুধু প্রশাসনিক অন্তর্ভুক্তি করলেই হবে না। বসুন্ধরার মতো পরিকল্পিত এলাকার ইতিবাচক দিকগুলোও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় নাগরিকেরা কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও পেতে পারেন।'

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত:

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বসুন্ধরাকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হলে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে না; বরং ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

কারণ, রাজধানীর আশপাশে গত দুই দশকে গড়ে ওঠা অনেক বড় আবাসন প্রকল্প এখনো পূর্ণাঙ্গ নগর প্রশাসনের বাইরে রয়েছে। এসব এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত স্থানীয় সরকারের ভূমিকা পালন করছে। এতে নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।

সরকার যদি বসুন্ধরা মডেল বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে রাজধানীসংলগ্ন আরও কয়েকটি বড় আবাসিক প্রকল্পকেও একই কাঠামোয় আনার পথ তৈরি হতে পারে।

এখন নজর মন্ত্রিসভার বৈঠকে:

আইনের খসড়া ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পৌঁছেছে। এখন সেটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের অপেক্ষা। আগামি বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এটি অনুমোদন মিললে পরবর্তী ধাপে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। তারপর গেজেট জারি হবে। 

সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে ‘আলাদা নগর’ হিসেবে পরিচিত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা শেষ পর্যন্ত রাজধানীর আনুষ্ঠানিক নগর কাঠামোর অংশ হতে যাচ্ছে কি না-সেই উত্তর মিলতে পারে খুব শিগগিরই।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন